Darjeeling

Darjeeling জেলা গড়ে উঠার ইতিহাস

darjeeling ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জলপাইগুড়ি বিভাগের একটি জেলা ।darjeeling জেলার শহর ও পৌরসভা এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে 7100 ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। এই জেলার উত্তরে সিকিম রাজ্য, দক্ষিনে বিহার রাজ্য ,পূর্বে জলপাইগুড়ি জেলা ও পশ্চিমে নেপাল অবস্থিত ।

কার্শিয়াং, শিলিগুড়ি ,দার্জিলিং জেলার তিনটি প্রধান শহর। দার্জিলিং জেলা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অধীনে থাকলেও দার্জিলিং শহর সহ নির্দিষ্ট এলাকায় আংশিক স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন রয়েছে ।দার্জিলিংয়ের মূলরোম পাহাড়ি শহর পর্যটন ও চায়ের জন্য বিখ্যাত ।

কাঞ্চনজঙ্ঘার অনুপম সৌন্দর্য এবং টাইগার হিলের চিত্তাকর্ষক সূর্যোদয় দেখার জন্য, প্রতিবছর বহু পর্যটক এখানে ভিড় করে। পাহাড়ের রানী হিসেবে খ্যাত ভারতবর্ষের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ দার্জিলিং সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু আলোচনা করা হলো।

ভৌগোলিকভাবে দার্জিলিং জেলার দুটি অঞ্চলে বিভক্ত ।

পার্বত্য অঞ্চল ও সমতল অঞ্চলে পার্বত্য অঞ্চল টি বর্তমানে গোর্খাল্যান্ড আঞ্চলিক প্রশাসন নামে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধীনস্থ আধা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আওতাভুক্ত ।এই এলাকা দার্জিলিং, কালিম্পং ও কার্শিয়াং বিভক্ত।

তবে গুরুত্বপূর্ণ শহর কালিম্পং মহকুমাকে 2017 সালের 14 ই ফেব্রুয়ারি পৃথক কালিম্পং জেলা ঘোষণা করা হয় । হিমালয় পর্বত শ্রেনীর পাদদেশের সমভূমি তে শিলিগুড়ি মহকুমা অবস্থিত। এই সমভূমি তরাই অঞ্চল নামেও পরিচিত ।

আবহাওয়া:

দার্জিলিং শহরের হিমালয়ের পাহাড়ি অঞ্চলের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে ।ঋতুভেদে এর তাপমাত্রা 1 থেকে 20 ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। তবে এর বার্ষিক গড় তাপমাত্রা 15 ডিগ্রী সেলসিয়াস ।দার্জিলিংয়ের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা -24 ডিগ্রি সেলসিয়াস যা রেকর্ড করা হয়েছিল হাজার 1905 সালের ফেব্রুয়ারিতে।

দার্জিলিংয়ের সাধারণত তুষারপাত হয় না ।তবে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সামান্য তুষারপাতের সম্ভাবনা থাকে ।2019 সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি দার্জিলিঙে বিগত এক দশক এর সর্বোচ্চ তুষারপাত দেখা যায়। দার্জিলিং শহরে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় ।প্রতিবছর গড়ে 126 দিন বৃষ্টি হয় দার্জিলিঙে সর্বাধিক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকে জুলাই মাসে।

পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাত হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় প্রাকৃতিকভাবেই দার্জিলিং চা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত ।ভারতের 16টি রাজ্যে চা শিল্প বিকশিত হলেও ,দার্জিলিং চা এর সমকক্ষ চা কোথাও উৎপাদিত হয় না। শুধু ভারতেই নয় বরং সারা বিশ্বের চা শিল্পের তুলনায় দার্জিলিংয়ের চা কে সেরা বিবেচনা করা হয়।

দার্জিলিং উপত্যকায় উৎপাদিত চিনা ক্যামেলিয়া প্রজাতির এই চা ভারতের অন্য কোথাও উৎপাদন করা সম্ভব নয় । বিশেষ বিবেচনায় এই জাতের চা এর নামই হয়ে গেছে দার্জিলিং চা। দার্জিলিংয়ের 20 হাজার হেক্টর জমিতে গড়ে ওঠা 83 টি চা বাগানে বছরে গড়ে প্রায় 1 কোটি 20 লক্ষ কেজি দার্জিলিং চা উৎপাদিত হয় ।

দার্জিলিং এর ইতিহাস:

1780 সালের পূর্বে দার্জিলিংয়ের এলাকা সিকিমের সোকালদের মালিকানাধীন ছিল ।তারা বেশ কয়েকবার নেপালদের আক্রমণ করে পরাজিত হয়। পরবর্তীতে নেপালি গরখারা সিকিম আক্রমণ করে দার্জিলিং এবং শিলিগুড়ি অঞ্চল দখল করে নেয় ।

উনিশ শতকের শুরুর দিকে গরখারা তিস্তা নদী পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয় করেন, তখন পুরো উত্তর সীমান্তে গোর্খাদের দমন করতে ব্রিটিশরা উঠেপড়ে লাগে ।1814 সালের আঙলো গোর্খা যুদ্ধে গরখারা পরাজিত হলে ব্রিটিশরা অঞ্চলের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হয়ে ওঠে 1828 সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দার্জিলিং অঞ্চলে ব্রিটিশ সৈন্য বাহিনীর জন্য স্বাস্থ্য উদ্ধার কেন্দ্র নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

1835 সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অঞ্চলের কিছু অংশ সিকিমিসদের কাছ থেকে লিস নেয় ।তারপর 1850 সালের মধ্যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দার্জিলিংয়ের 17 বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে। 1864 সালে ভুটান ও ব্রিটিশরা সিনচুরা চুক্তি স্বাক্ষর করলে কালিম্পং সহ পাহাড়ের গিরিপথ গুলো ব্রিটিশ রাজের নিয়ন্ত্রণে আসে।

1865 সালের মধ্যে তিস্তা নদীর পূর্ব তীরও ব্রিটিশদের হস্তগত হয় ।1866 সালের মধ্যে 3200 বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে দার্জিলিং জেলা গঠিত হয় ।2017 সালে কালিম্পং জেলা পৃথক হওয়ার আগ পর্যন্ত দার্জিলিং জেলার আয়তন অপরিবর্তিত ছিল।

গ্রীষ্মকালে প্রচন্ড তাপদাহ থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশরা দার্জিলিংয়ের মনোরম আবহাওয়ায় বসবাস করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে দার্জিলিং একটি শৈল শহর ও স্বাস্থ্য উদ্ধার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে। আর তার ক্যাম্পবেল ও রবার্ট নেপিয়ার এই পাহাড়ী শহর গঠনে অগ্রণী ভূমিকা নেয়।তাদের প্রচেষ্টায় 1835 থেকে 1849 সালের মধ্যে পাহাড়ের ঢালে চাষাবাদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু হলে দার্জিলিং এর জনসংখ্য শত গুণ বৃদ্ধি পায়।

1839 থেকে 1842 সালের মধ্যে সমতলের সাথে সংযোগকারী প্রথম সড়কপথ নির্মিত হয়। 1848 সালে ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য অস্ত্রাগার নির্মিত হয় এবং 1850 সালে এই শহরকে পৌরসভায় উন্নীত করা হয় ।1856 সালে দার্জিলিঙে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হলে ,বেশকিছু ব্রিটিশরা প্রস্তুতকারক এখানে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে ।

1864 খ্রিস্টাব্দে দার্জিলিং শহরকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয় ।স্কটিশ ধর্মপ্রচারকরা ব্রিটিশ অধিবাসীদের জন্য এখানে একাধিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। 1881 খ্রিস্টাব্দে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে চালু হলে ,শহরের উন্নয়ন আরো দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে ।

ব্রিটিশ শাসনকালে শুরুতে দার্জিলিঙে অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত জেলা হিসেবে গণ্য করা হতো। যার ফলে ব্রিটিশ ভারতের অন্যান্য জেলা গুলিতে প্রযোজ্য আইন এই অঞ্চলে বলবৎ হতোনা। 1919 সালে এই অঞ্চলকে একটি পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় দার্জিলিং অঞ্চলের চা বাগান গুলিতে অসহযোগ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। 1934 সালে সশস্ত্র বিপ্লবী বাংলার গভর্নর সার্জন অ্যান্ডারসনকে দার্জিলিংয়ে হত্যার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে 1940 এর দশকে এই জেলার চা শ্রমিকদের সংগঠিত করে কমিউনিস্টরা ।ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু করে।

1947 সালে ভারতের স্বাধীনতার পর দার্জিলিং কার্শিয়াং ,কালিম্পং তরাই অঞ্চলের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত দার্জিলিং জেলা কে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সাথে যুক্ত করা হয়। পাহাড়ে নেপালিরা প্রধান জনগোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করলেও তরাই সমতল অঞ্চলে বহু সংখ্যক বাঙালি বসবাস করতে শুরু করে ।

নেপালিদের দাবির প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিস্পৃহ মনোভাবের কারণে, দার্জিলিংয়ের সয়ত্ব শাসন ও নেপালি ভাষার স্বীকৃতির জোর দাবি ওঠে। 1975 খ্রিস্টাব্দের সিকিম নামক একটি নতুন রাজ্যের উদ্ভব হলে এই অঞ্চলে গোর্খাল্যান্ড নামক একটি নতুন রাজ্য তৈরীর জন্য ব্যাপক হিংসাত্মক আন্দোলন শুরু হয় ।

1988 সালে গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট ও সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে দার্জিলিং পার্বত্য পরিষদ নামক একটি নির্বাচিত প্রতিনিধি দলের সৃষ্টি করা হয়। 2007 সালে আবার নতুন করে গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে আন্দোলন করতে শুরু করে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার তাদের সাথে আলোচনা করে গোর্খাল্যান্ড আঞ্চলিক প্রশাসন নামে নতুন একটি আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠন করে।

কিন্তু এখনো পর্যন্ত নানা কারণে এ অঞ্চলের পাহাড়ি জনতা পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *