the story of pubg

মরণ খেলা পাবজি।The Story Of PUBG

ভিডিও গেমস এর মধ্যে বর্তমানে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে Player Unknown’s Battlegrounds বা PUBG যা পাবজি নামে পরিচিত ।প্রতিদিন বিশ্বব্যাপী কমপক্ষে তিন কোটি মানুষ এই গেমটি খেলে। প্রায় সকল বয়সী মানুষের কাছেই গেমটির সমান জনপ্রিয়, জনপ্রিয়তার পাশাপাশি PUBG বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। গেমটি এর খেলোয়ারদের মধ্যে সহিংসতা ঢুকিয়ে দিচ্ছে। অনেকের মতে এই খেলা হিংস্র মনোভাব আগ্রাসন এবং সাইবার গুন্ডামি প্রচার করে ।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন গেমটির অত্যধিক সহিংসতার গেমারকে আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে। বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত গেম Player Unknown’s Battlegrounds সম্পর্কে বিস্তারিত জানব ।

গেমটি পরিকাঠামো:

পাবজি গেম আবর্তিত হয় একাধিক পরিত্যক্ত শহর কে কেন্দ্র করে। যেসব শহরের রাস্তাঘাট বাড়িঘরসহ, সকল জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধাস্ত্র ।খেলার শুরুতেই 100 জন খেলোয়াড় কে একটি বিমানে করে নিয়ে যাওয়া হয় যেকোনো একটি শহরের উদ্দেশ্যে ।শহরের উপর দিয়ে বিমান থেকে লাফ দিয়ে প্যারাসুটে ভর করে নামতে হয় সেই মৃত্যুপুরীতে। সেই মৃত্যুপুরীতে নামার সাথে সাথেই প্রধান কাজ হলো পরিত্যক্ত অবকাঠামোর মধ্য থেকে বন্দুক বর্ম ও যানবাহনসহ অন্যান্য বেঁচে থাকার সরঞ্জাম খুঁজে বের করা ।এরপর প্রত্যেক খেলোয়াড়ই একে অপরকে খুঁজে বেড়াতে থাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে। শেষ পর্যন্ত যে বেঁচে থাকবে সেই হবে খেলার বিজয়ী।

একটি পূর্ণ রাউন্ড গেম খেলতে গড়ে প্রায় 30 মিনিটের মত সময় লাগে। কে কতক্ষণ খেলায় টিকে ছিল এবং কত বেশি খেলোয়াড় কে হত্যা করতে পেরেছে তার উপর নির্ভর পয়েন্ট প্রদান করা হয়।খেলার এই ধরণতটাকে বলা হয় Battle Royel।

ভিডিও গেমস খেলোয়াড়েরা বহুদিন থেকে ব্যাটেল রয়েল গেম খেলতে চাচ্ছিল। Battle Royel হল এমন এক প্রকার গেম যেখানে নির্দিষ্ট একটি এলাকার মধ্যে বেশকিছু খেলোয়াড় থাকবে এবং তাদের প্রত্যেকের লক্ষ্য হবে একে অপরকে খুঁজে বের করে হত্যা করা । এভাবে শেষ পর্যন্ত যে টিকে থাকবে সেই হবে বিজয়ী।

প্রস্তুতির প্রেরণা:

Battle Royel ধারার প্রথম উদাহরণ হল 2007 সালে মুক্তি পাওয়া জাপানি সিনেমা ‘বতেরও বৈয়ারু’ বা Battle Royel একই নামে প্রকাশিত একটি বই এর উপর ভিত্তি করে সিনেমাটি নির্মাণ করা হয়

এর কাহিনী হলো 42 জন জাপানি শিক্ষার্থীকে একটি দ্বীপে ছেড়ে দেয়া হয় এবং তাদের একে অপরকে হত্যা করতে বাধ্য করা হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না শুধুমাত্র একজন বেঁচে থাকে।এরপর 2012 সালে হলিউডে মুক্তি পায় প্রায় একইরকম কাহিনীর চলচ্চিত্র “দি হাঙ্গার গেমস “চলচ্চিত্রটি মুক্তির পরপরই Battle Royel গমের চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। কিন্তু তখনো পর্যন্ত এ ধরনের কোনো পূর্ণাঙ্গ গেম ছিলনা।

সে সময় একজন ব্যক্তি এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ গেম তৈরীর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল, সে হলো ব্রেন্ডন গ্রিন তার ছদ্মনাম player unknown’s।Eyeris এই ওয়েব ডিজাইনার আরমা ও ডেজি গেমের প্রেমে পড়েছিল ।আরমা হলো অতি বাস্তববাদী সাময়িক গোলাগুলির গেম ।নিখুঁত ও জীবন্ত গ্রাফিকের কারণে গেমটি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পায়। সে কারণে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই সব গেমের বেশকিছু পরিবর্তিত সংস্করন
বা মডার্ন ভার্শন বের হয় ।

কিন্তু সবচেয়ে জনপ্রিয় হয় ব্র্যান্ডন গ্রিনের তৈরি ডেইজি গেমের ব্যাটল রয়্যাল মোড ভার্সন। তখনই Sony অনলাইন এন্টারটেইনমেন্ট Key of the kill নামে একটি নতুন গেম তৈরি করার জন্য ব্রেন্দন গ্রীনেকে নিয়োগ দেয়। এরপর 2016 সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ভিডিও গেম নির্মাতা Bluehole, ব্র্যান্ডন গ্রিনকে একটি বড় ধরনের গমে প্রস্তুতের প্রস্তাব দেয় । ব্র্যান্ডন গ্রিন কোরিয়ান ভিডিও গেম ডিজাইনার চ্যাং হেন কিম ও তার দলের সাথে মিলে তৈরি করে বহুকাঙ্খিত পূর্ণাঙ্গ গেম এর নাম দেওয়া হয় প্লেয়ার আননোওন’স ব্যাটলগ্রাউন্ড বর্তমানে যা পাপজি নামে অধিক পরিচিত ।

জনপ্রিয়তা:

2017 সালের মার্চে পাবজি যখন বাজারে আসে তখন এরকম গেম বাজারে দ্বিতীয় টি ছিলনা। দুর্দান্ত গ্রাফিকের সাথে এই গেমে রয়েছে ভরপুর উত্তেজনা ও একশন।গেমটির অন্যতম আকর্ষণ হলো এর ভার্চুয়াল জগত পাহাড় নদী খোলা প্রান্তর থেকে শুরু করে নানা ধরনের মানব নির্মিত অবকাঠামোর আদলে গেমের ভেন্যু সাজানো হয়েছে। মাত্র 20 ডলার মূল্যে বাজারে আসে বহুকাঙ্খিত এই গেমটি মুক্তির প্রথম দিনেই আয় করে 11 মিলিয়ন ডলার বা প্রায় 92 কোটি টাকা। প্রথম সপ্তাহ থেকেই এর খেলোয়াড় সংখ্যা অতি দ্রুত বাড়তে থাকে ,প্রথম মাসেই গেমটি প্রায় 10 লক্ষ কপি বিক্রি হয়। তার পরবর্তী দুই মাসে এর খেলার সংখ্যা প্রায় 40 লাখ ছাড়িয়ে যায়।

2017 সালের শেষের দিকে এটি বহু দিনের জনপ্রিয় গেম নিজেকে league of legends কে ছাড়িয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় গেমের তকমা লাভ করেন। এরপর চাইনিজ গেম নির্মাতা টেনসেন্ট ব্যাটেল গ্রাউন্ড এর মোবাইল সংস্করণ তৈরি করে। তখন থেকে গেমটি প্রতিনিয়ত তার নিজের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে
এখনো পর্যন্ত সমস্ত প্লাটফর্মে প্রায় 20 কোটিরও বেশি ডাউনলোড এর মাধ্যমে এটি সর্বকালের সেরা বিক্রিত গেম গুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে প্রতিদিন কমপক্ষে তিন কোটি মানুষ এই গেমটি খেলে ।

ক্ষতিকারক দিকগুলি:

ব্যাপক জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ব্যাটেল গ্রাউন্ড কে ঘিরে রয়েছে বহু বিতর্ক ।এই অনলাইন গেম এর প্রতি শিশুরা অত্যন্ত নাজুক ।অনেক অভিভাবকের অভিযোগ এই গেম খেলার পরে বাচ্চাদের আচরণে আক্রমনাত্মক স্বভাব লক্ষ্য করেছেন তারা ,আসক্ত শিশুরা এই গেম খেলা ছাড়া আর কোনো কিছুতেই প্রাধান্য দিতে চায় না। তখন তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় গেমে জয়ী হওয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই গেম শুধু শিশু নয় প্রাপ্ত বয়স্কদের মানসিক বিকৃতি ঘটাতে পারে।

এটি কারো কারো জন্য এক ধরনের ক্ষতিকর মাদক আসক্তির কারণে অনেকেই গেমটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন ।ভারতের গুজরাটের সর্বপ্রথম গেমটি নিষিদ্ধ করা হয়, এই গেম খেলার অভিযোগে 10 জন কলেজ ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ।ভারতে পাবজি কে কেন্দ্র করে আরো বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটে।

এক বাবা তার ছেলের পাবজি আসক্তি লক্ষ করলে জোর করে ছেলের গেম খেলা বন্ধ করে দেন ।তখন তার সন্তান পাবজি খেলতে না পারার অভিমানে আত্মহত্যা করে ।ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের টানা 45 দিন ধরে পাবজি খেলতে খেলতে ঘাড়ের ব্যথায় অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে আরেক যুবক ।রেললাইনের ওপর দিয়ে গেমটি খেলতে খেলতে যাওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে আরো দুজন ।এমনকি নির্বিঘ্নে পাবজি খেলার জন্য স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়েছেন এক ব্যক্তি।

এসব ঘটনা থেকেই বোঝা যায় গেমটি কিছু লোকের জন্য কতটা আসক্তিকর ।ফিলিপাইনে সরকারি কর্মকর্তাদের পাবজি খেলতে দেখলে সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গেমটির সহিংস বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে, সম্প্রতি নেপালে সমগ্র দেশজুড়ে গেমটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে ।একই অভিযোগে চীনে আরো বহু আগেই নিষিদ্ধ হয়েছিল পাবজি। বিশেষজ্ঞদের মতে নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলার ঘাতক এজাতীয় অনলাইন গেম গুলো থেকে সরাসরি অনুপ্রাণিত হয়েছিল ,অন্যদিকে ভক্তরা বলছে এই গমে তাদের দৈনন্দিন জীবনের হতাশা কাটাতে সাহায্য করে। নিষিদ্ধ করা হয় তবে সিনেমায় দেখানো সহিংসতা থেকে শুরু করে টেলিভিশন খবরের সহিংস ভিডিওগুলো নিষিদ্ধ করা হোক।

অনেকেই আবার বলছেন নিষিদ্ধ করা কোনো সমাধান নয় কারণ, কোন অনলাইন পণ্য নিষিদ্ধ করা হলেও তা ব্যবহারের অনেক বিকল্প পথ থেকেই যায় ।তাই শিশুসহ এজাতীয় গেম খেলোয়াড়দের অনুভূতি উপলব্ধি করে তাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান করতে হবে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *